শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:০৬ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
Logo দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়নকে অগ্রসর করতে ইন্দোনশিয়া সফরে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী Logo ১৯২৪ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফা’ইউয়ান মন্দির পরিদর্শন করেন Logo শুরু হয়েছে বেইজিং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব Logo চীনা প্রধানমন্ত্রীর সাথে বেইজিংয়ের মহাগণভবনে জার্মান চ্যান্সেলরের বৈঠক Logo চীন সফর করলেন জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ Logo চতুর্থ চীন আন্তর্জাতিক ভোগ্যপণ্য মেলা চলবে ১৮ এপ্রিল Logo ২১৫ টি দেশ ক্যান্টন মেলা কুয়াং চৌতে নিবন্ধন করেছেন Logo রামগঞ্জে নানান আয়োজনে পহেলা বৈশাখ পালিত Logo সেপটিক ট্যাংকে নেমে প্রাণ গেল বাড়ির মালিকসহ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর Logo শোক সংবাদ: বীর মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত আলী পাইনের ইন্তেকাল
নোটিশঃ
যে কোন বিভাগে প্রতি জেলা, থানা/উপজেলা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ‘bdpressnews.com ’ জাতীয় পত্রিকায় সাংবাদিক নিয়োগ ২০২৩ চলছে। বিগত ১ বছর ধরে ‘bdpressnews.com’ অনলাইন সংস্করণ পাঠক সমাজে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পাঠকের সংখ্যায় প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নানা শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছে তরুণ, অভিজ্ঞ ও আন্তরিক সংবাদকর্মীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ‘bdpressnews.com‘ পত্রিকায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার এ ধাপ

৭ই মার্চের ভাষণ ও আমার বাবা

নাসিমা খাতুন ( সীমা হক) / ২১৩ Time View
Update : শুক্রবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৪, ৭:২০ অপরাহ্ন

আমার বাবা আব্দুল ওহাব, আমার দাদা মরহুম করিম বক্স মন্ডল। আদি নিবাস, গ্রাম-ভগবানপুর থানা-ভগবানগোলা, জেলা- মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ,ভারত। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগেই আমার বাবা পূর্ববঙ্গে চলে আসেন। শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে আড়ানী হাইস্কুল রাজশাহী, ভূমি অফিসে চাকরিলাভের মাধ্যমে। চাকরী লাভ ১৯৫২ সাল। ছিলেন এল ডি এ ভূমি অফিস। প্রথম চাকরীস্থান- বিলমাড়িয়া ভূমি অফিস, থানা- লালপুর, জেলা- তৎকালীন বৃহত্তর রাজশাহী, বর্তমানে নাটোর। নাটোর থেকে বদলী হয়ে চলে যান বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি থানার বুড়িমারী ভূমি অফিস। সেখান থেকে বদলী হন বগুড়া সদর ভুমি অফিস, মালতীনগর, বগুড়া।

আমার স্মৃতিতে আব্বা আছেন ১৯৬৯ সালের শেষের দিক থেকে। আমরা বগুড়া মালতীনগর সরকারী ষ্টাফ কোয়ার্টারের তৎকালীন চার নম্বর বিল্ডিং এর প্রথম গেটের পশ্চিম পাশের তিনতলায় বাস করতাম। আমরা তিন বোন বাবা মা। আমার মায়ের কোলাহলপূর্ণ সুখের সংসার ছিলো। আমার বাবা ছিলেন একজন পরিশ্রমী, ধার্মিক, স্নেহবৎসল এবং স্বাধীনচেতা মানুষ।যখন এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে স্বাধীনতার ডাক আসলো, চতুর্দিকে বাজছিলো,” মুজিব বাইয়া যাওরে,নির্যাতিত দ্যাশের মাঝে জনগনের নাও রে মুজিব বাইয়া যাওরে।” তখন আমার বয়স সাড়ে ছয় বছর।

বগুড়া ষ্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর দিকে কিছু আবাদী জমি তারপর মালতীনগর আবাসিক এলাকা। কিছু পাকা বাড়ি কিছু মাটির বাড়ী।পূর্বদিকে পিওন কোয়ার্টার, পশ্চিম দিকে ঘন বাঁশের ঝাড়ের মধ্যদিয়ে পায়ে চলা মেঠোপথ। আর দক্ষিণ দিকে ছিলো বিরাট বিহারী বস্তি। আমার স্বাধীনচেতা বাবার দিকে বিহারীদের সবসময়ই কটাক্ষ নজরদারি ছিলো। এটা আমার চোখের দেখা। আব্বা অনুভব করলেন ষ্টাফ কোয়ার্টারে একটা মসজিদ দরকার। সাথে সাথে নিজেই উদ্যোগী হয়ে পড়লেন। চাটাই দিয়ে ঘিরে টিনের ছাপরা দিয়ে মসজিদ বানালেন এবং হুজুর রাখলেন। বর্তমানে ষ্টাফ কোয়ার্টারে যে মসজিদ সেটা আমার বাবার হাতের। এখন পাকা হয়েছে। আব্বা ঐ মসজিদের প্রথম সেক্রেটারী। ফজর,মাগরিব এবং এশার নামাজের আজান আমার বাবার কন্ঠেই শুনতাম। অমন আজান অদ্যাবধি আর শুনতে পাই না। শীতের সময় আম্মা উঠে পানি গরম করে দিতেন। আব্বা গরম পানিতে অজু করে মসজিদে গিয়ে আজান দিতেন, আমি বিছানায় শুয়ে আমার বাবার কণ্ঠে আজান শুনতাম। আব্বা আমাদের কিছু নিয়ম করে দিয়েছিলেন, ‘ ফজরের নামাজ পড়ে আব্বা মসজিদ থেকে বের হবেন আর আমরা তিন বোন আব্বার সামনে হাজির হবো। আমার ছোট বোন পপি খুব সুন্দর আর মোটা ছিলো। ওকে কোলে নিয়ে আমি সিড়ি দিয়ে উঠা নামা করতে পারতাম না। আম্মা আমাদের তিন বোনকে নিচের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। তারপর আমি বোনদের নিয়ে আব্বার সামনে হাজির হতাম। মেজো বোন লিমা আর আমি আগে আগে দৌড় দিতাম আর আব্বা পপিকে কোলে নিয়ে পেছন পেছন হাঁটতেন। যতদুর মনে পড়ে দিনে দিনে আব্বার সাথে আরও অনেকেই প্রাতভ্রমন শুরু করলেন। অনেক আলাপ করতেন আব্বার সাথে। কি কথা আমি বুঝতাম না। শুধু আব্বার কথাগুলো এখনও কানে বাজে,”দেশের পরিস্থিতি খুব খারাপ। বিহারীরা আজ অমুক জায়গায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। অমুক ছেলেকে মেরেছে।” পাশের বস্তির বিহারীরা কথাগুলো শুনে ফেলবে বা কেউ বলে দিবে বা বিহারীরা আব্বার ক্ষতি করবে এই চিন্তা এটা আব্বা জানতেন কিন্তু তোয়াক্কা করতেন না।

৭০ সালের জানুয়ারি মাসের দুই তারিখে আমার ছোট বোন পপির জন্ম বগুড়া গিলবার্ট মিশন হসপিটালে। আম্মাকে আব্বা হাসপাতালে নিয়ে গেলেন তখন গভীর রাত। তিন নম্বর বিল্ডিং এর একেবারে পশ্চিম পাশের নিচতলায় একটা হিন্দু পরিবার ছিলো। পরিবার প্রধান বয়োঃবৃদ্ধ ভদ্রলোক। তাঁর এক মেয়ে আর এক ছেলে। এই তিন জন পরিবারের সদস্য ছিলেন। ছেলেটা কোন অফিসারের গাড়ী চালাতেন। ঐ বাসার সামনে একটা জীপগাড়ী থাকতো। তো ঐ ড্রাইভার সাহেবকে আব্বা আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন। আমি দেখলাম আম্মাকে ধরে নিয়ে আস্তে আস্তে নিচে নেমে গাড়ীতে উঠলেন। আমাদের বাসায় থেকে তারাভাই কলেজে পড়তেন। আব্বা আমাকে বললেন,” তোমার ভাইয়ার সাথে থাকো আমি আসছি। আম্মাকে হাসপাতালে ভর্তি করে আব্বা বাসায় আসলেন, তখন সকাল হয়েছে।

আম্মাকে হাসপাতালে রেখে আব্বা বাসায় এসে তাড়াতাড়ি আমাকে আর লিমাকে রেডী করে নিয়ে আবার হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। হাসপাতালের গেটে একজন শিষ্টার বললেন,” আপনার মেয়ে হয়েছে।” তৃত্বীয় কন্যা সন্তানের বাবা এতটাই উৎফুল্ল হলেন যে তাড়াতাড়ি দেখতে চাইলেন। শিষ্টার বাচ্চা রাখার রুমে গেলেন এবং পপিকে হাতের উপর নিয়ে জানালা দিয়ে আমাদের দেখালেন। ঐ রুমে আমাদের প্রবেশের অনুমতি ছিলো না। আম্মার সাথে সেদিন দেখা হলো না। ছয়দিন পর আম্মা বাসায় আসলেন। আমি ভেবেছিলাম ঐ ড্রাইভার কাকা আবার গাড়ী নিয়ে আম্মাকে আনতে যাবেন আর সেই গাড়ীতে আমিও যাবো। কিন্তু তা হলো না। আব্বা রিকসায় আম্মাকে নিয়ে আসলেন। তবে ঐ পরিবারের সাথে আব্বার অনেক ভালো সম্পর্ক ছিলো। হিন্দু মুসলিম বিভেদ আমার বাবার মনে ঠাঁই পায়নি কোনদিন।

নিভে যাওয়ার আগে প্রদীপ দপ করে জ্বলে উঠে এবং মুহুর্তেই নিভে যায়। ৪ নম্বর বিল্ডিং এর নিচে আব্বা একটা সবজী বাগান করেছিলেন। সেখানে তিন মেয়ের ছবি তুললেন, পাকী সরকার ষ্টাফ কোয়ার্টারে বাচ্চাদের খেলনা দিলো। স্লীপ, ঢেকী,দোলনা ইত্যাদী। সেখানে আব্বা আমাদেরকে নিয়ে ছবি তুললেন। ছাদের উপর ছবি তুললেন। ঈদের দিনে আমরা তিন বোন সবার আগে রেডী হয়ে বের হতাম। শুধু অফিস টাইম ছাড়া সব সময় আব্বার সাথে সাথে ঘুরতাম। আর ঐ বিহারীরা কটাক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। তার কারণ হিসেবে আমি এখন যা উপলব্ধি করি তা হলো, আব্বা কোনদিন বিহারীদের সাথে কথাও বলতেন না। আমি সারা ষ্টাফ কোয়ার্টারে ছুটাছুটি দৌড়াদৌড়ি করে খেলতাম। কিন্তু বিহারী কলোনী কোনদিন যাইনি। আব্বার নিষেধ ছিলো।

আব্বা ৩টা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন আমাকে। এক, বিহারী কলোনী যাবে না দুই, মাগরিবের আজানের আগে বাসায় আসবে তিন, দূরে ট্রাক দেখলে রাস্তা পার হবে না, ট্রাক চলে গেলে তারপর রাস্তা পার হবে। আমার বাবা গুন গুন করে গান গাইতেন। ক্যাম্পাসের মেয়ে বাচ্চাদের মা ডাকতেন। এমনিভাবে আমাদের সুখের দিনগুলো শেষ হয়ে গেলো।

সত্তর সালের জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসলো। চারিদিকে মিছিল আর মিছিল। ” তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। ভোট দিবেন কোনখানে নৌকার মাঝখানে ইত্যাদী। আব্বা অফিস থেকে বাসায় এসেই পপিকে কোলে নিয়ে জানালার ধারে দাঁড়াতেন। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতেন। যখন নিচে যেতেন রাস্তায় হাঁটতেন তখন দেশের কথা, দেশের পরিস্থিতির কথা আলাপ করতেন।

আমাদের নিচতলায় সালাম ভাইয়ারা থাকতেন। সালাম ভাইয়ার বাবা আবুল চাচার খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো আব্বার সাথে। সালাম ভাইয়া আব্বার খুব প্রিয় ছিলেন। আব্বার শুধু ডাকবেন,”সালাম ” সাথে সাথে সালাম ভাইয়া আব্বার সামনে হাজির।

৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ভোটে আব্বার দায়িত্ব পড়লো পাঁচবিবি অথবা কাহালু থানায়। আমার সদা সচেতন, দায়িত্বশীল বাবা ঠিক করলেন, একদিন আগেই ভোট সেন্টারে যাবেন। একটা বেডহোল্ডার কিনে বেডিংপত্র গুছিয়ে নিলেন। যেদিন রওনা হবেন তার আগের রাতে আমরা রাতের খাবার খেতে বসেছি। আমার এখনও মনে আছে চারদিকের পরিবেশ থমথমে ছিলো। শুধু আমাদের বাসায় পপি খুব চিৎকার চেঁচামেচি করছিলো। হঠাৎ নিচ থেকে কে যেন ধুপ ধাপ শব্দ করে আমাদের দরজার সামনে আসলো। একটা ধাক্কা দিলো। আব্বা খাবার রেখে তড়িৎবেগে দরজার কাছে গেলেন। কিন্তু দরজা খুললেন না। আব্বার উপস্থিতি টের পেয়ে আগন্তক আবার ধুপ ধাপ করে নিচে নেমে গেল। আব্বা বললেন, ” নিশ্চয় বিহারী এসেছিলো। ওরা ভেবেছিলো আমি বাসায় নেই। আজ ওরা নিশ্চয় আমার পরিবারের ক্ষতি করতো।

পরদিন আব্বা ভোট নিতে গেলেন না। সালাম ভাই, তাঁর আব্বা আবুল চাচা, আট নম্বর বিল্ডিং এর মান্নান মামা এবং আরও অনেক জনকে ডেকে রাতের ঘটনা বললেন। আর আম্মাকে সাবধানে থাকতে বলে একেবারে ভোটের আগের দিন সরকারী দায়িত্ব পালন করতে গেলেন। বগুড়া করনেশন স্কুলে আম্মার ভোট ছিলো। আম্মাও ভোট দিয়ে আসলেন। ভোট হলো। ফলপ্রকাশ হলো। কিন্তু ফলাফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো না।

 

দিনে দিনে আমার বাবার পরিবর্তন হতে লাগলো। আমার সদাহাস্যজ্জল বাবা গম্ভীর হয়ে গেলেন। আগের ফ্রেশ মনোভাব হারিয়ে গেল। দেশের পরিস্থিতিও খারাপ হয়ে গেল। আমার তখন অতো কিছু বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু আব্বা আম্মা ভয়ানক কিছু আঁচ করছেন তা আমি বুঝতাম। মাঝে মাঝেই আমার নিচে খেলতে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতো। যেতে দিতেন না। আমার মেজো বোন লিমা সবসময় আব্বার গলা ধরে ঘুমাতো। ওর পাশে আমি। তো বিছানায় শুয়ে শুয়ে আব্বা আমাদের দু’বোনকে দোয়া ইউনুস শিখিয়ে দিলেন। বললেন,” মা এটা বিপদের দোয়া। যখন বিপদ দেখবে তখনই এটা পড়বে।” আর একদিন একটা ছেলে খালি গায়ে একটা কালো প্যান্ট পরা, আমাদের বিল্ডিং এবং বি টাইপ বিল্ডিং এর মাঝে এমন জায়গায় বসলো যেখান থেকে আমাদের বাসা পুরোপুরি লক্ষ্য করা যায়। আব্বা কখন বাসায় আসেন, কখন বাইরে যান সব যেন দেখা যায়। সবাই দেখলো। আম্মা ভয়ে কাঁপছেন। পাশের বাসার খালাম্মা ওকে দেখে তাড়াতাড়ি আমাদের বাসায় এসে আম্মার সঙ্গে অনেক ভয় ভীতি প্রকাশ করলেন। কিন্তু আমার বাবার সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। আব্বা তখন আর অফিসে যান না। পাকিস্তান সরকার লাইসেন্সধারী অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিলো। আমার বাবা বন্ধুক জমা দিলেন না। আমি শুধু দেখি সবাই কি যেন আলাপ করেন। আব্বা নিচে যেয়ে, আমাদের নিয়ে হাঁটার সময় অন্য কলিগদের সাথে খুব জোরে জোরে কথা বলেন। বাসায় আম্মাকে বলেন,” সাহস করো সাহস করো বিশ্ব যুদ্ধ তো দেখোনি। সাহস করো। ক্ষমতা হস্তান্তর করতেই হবে। দেশ স্বাধীন হবে। এভাবে দেশ চলতে পারে না।” আরও বললেন, ” যখন চারদিকে গোলাগুলি শুরু হবে, আমি যদি বাসায় না থাকি,তখন মেয়েদের নিয়ে তাড়াতাড়ি নিচতলার কোন বাসায় গিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়বে। অনেক মানুষের সাথে থাকার চেষ্টা করবে।”

আরও একদিন। তখন বুঝতাম না এখন বুঝি। ঢাকায় পঁচিশে মার্চের পরের ঘটনা। সেদিন আব্বা বাসায় ছিলেন না। দুপুরের পর। বাইরে প্রচন্ড গোলাগুলি হচ্ছে। আম্মা তিন মেয়েকে নিয়ে একদৌড়ে নিচতলায় একটা বাসায় চলে গেলেন। সেখানে আরও অনেক মহিলা এবং শিশুরা জড়ো হয়েছে। বড়রা দোয়া পড়ছেন। আমরাও দোয়া পড়ছি। সালাম ভাইয়া সহ আরও অনেক যুবক ছেলেরা ছুটাছুটি করছে। কোনদিকে যাবে হয়ত বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ পর সালাম ভাইয়া দৌড়ে আমাদের কাছে আসলেন। আম্মাকে বললেন,”পুলিশ লাইনে প্রচন্ড গোলাগুলি শুরু হয়েছে, বাঙালী পুলিশরা না খেয়ে যুদ্ধ করছে। তাঁদের খেতে দিতে হবে।” দেখলাম আম্মা এবং আরও কয়েকজন খালাম্মা মিলে অনেক রুটি বানালেন। আলু ভাজি করলেন। টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে দিলেন। খাবার নিয়ে সালাম ভাইয়া রা দৌড়ে চলে গেলেন। পরে শুনেছি দুর থেকে টিফিন ক্যারিয়ার ছুড়ে দিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ভিড়তে পারেননি।এভাবে দৌড়াদৌড়ি করে খাবার পৌঁছে সালাম ভাইয়ারা যখন বাসায় আসলেন তখন সন্ধ্যার আঁধার নামতে শুরু করেছে। আব্বাও আসলেন। আমরা তখনও নিচতলার সেই বাসায় আছি।

শোনা গেল আজ রাতেই বিহারীরা ষ্টাফ কোয়ার্টার আক্রমন করবে। আব্বা যুবকদের নিয়ে খুব গোপনে মিটিং করলেন। সবাই আতঙ্কিত এবং খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিলো। সবার উদ্দেশ্যে আব্বা বললেন,” আমার বন্দুক আছে, আপনারা প্রাচীরের ওপাশ থেকে বাঁশ কেটে আনেন।” ঠিক তাই হলো। অনেক বাঁশ কেটে আনা হলো। অনেক ইট জড়ো করা হলো। বাঁসগুলো দেড় দুই হাত সাইজের কেটে আগা সুচালু করা হলো। সব কাজ হলো আমাদের গেটের সামনে। তারপর সেই বাঁশের আর ইট কাঠের হাতিয়ারগুলো আমাদের বিল্ডিং আর বি টাইপ বিল্ডিং এর ছাদে উঠানো হলো। বিহারীরা আক্রমন করলে বাঙালী রুখে দিবে। আব্বা একটা কথা বারবার বললেন,” ওরা আক্রমন করলে আমরা ছেড়ে দিবো না। ষ্টাফ কোয়ার্টার বাঁচাতেই হবে।” তখন বগুড়া ষ্টাফ কোয়ার্টারে ৮৫/৯০ টা পরিবারের বসবাস। তাঁরা বাসের লাঠি আর ইট পাথর দিয়ে পাকিস্তান আর্মী আর বিহারীদের আক্রমন প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের সামান্য ব্যত্যায় হলো না। সারারাত পাহারা চললো। বিহারীরা সে রাতে আক্রমন করলো না। আমি কখন বাসায় যেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। পরদিন সকালে আম্মা বললেন,” আমাদের প্রতিরোধ বিহারীরা বুঝতে পেরেছিলো। তাই আক্রমন করেনি। তবে যে কোন সময় ষ্টাফ কোয়ার্টার আক্রমন করবে ওরা।বিহারীরা সে রাতে আক্রমন করেনি ঠিকই কিন্তু আব্বার উপর তাদের আক্রোশ আরও বেড়ে গেল।

পরদিন থেকে কোয়ার্টারের লোকজন যে যার মতো বাক্স প্যাটরা নিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়তে শুরু করলেন। সবাই গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছে। আমার বাবার সেদিকে কোন খেয়াল নেই। আমার মায়ের চোখে সমুদ্রের অথৈ জলরাশি। সবসময় আম্মা কাঁদেন। আব্বা সবসময় রেগে থাকতেন। আম্মা বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বললে আব্বা বললেন, আমার যাওয়া হবে না। স্বাধীনতার ঐ লাল সূর্যটা আমার বাবার চোখে এত তীর্যকভাবে আলো ছড়াচ্ছিলো যে চোখ দুটো সবসময় লালে লাল হয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে নিজেই বলতেন,” না এভাবে দেশ চলতে পারে না। স্বাধীনতা দিতেই হবে”। দুই- একদিন পর স্টাফ কোয়ার্টার প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল।

তখন স্টাফ কোয়ার্টার প্রায় ফাঁকা। শুধু যাদের বাড়ী অনেক দূরে, রাস্তা ঘাট বন্ধ থাকায় বাড়ী যাওয়া সম্ভব নয় তাঁরাই থাকলেন। তারমধ্যে সেই ড্রাইভার সাহেবের পরিবার। পরিবার বলতে তাঁর বাবা এবং বোন। তাঁরা হিন্দু হিসেবে বের হতে ভয় পাচ্ছিলেন এবং তাঁদের বাড়ী বরিশাল হওয়ায় বাড়ী যাওয়া সম্ভব ছিলো না। আর আমার বাবার বাড়ি যাওয়া সম্ভব হলেও, তিনি বাঘের বাচ্চা বাড়ী গেলেন না।

এমনই সময় হঠাৎ একদিন তারা ভাই আসলেন আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা ভাইদের বাড়ী বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি থানার আওলাকান্দী গ্রামে। তাঁর বাবা ডাক্তার কোবাদ হোসেন। তাঁদের সঙ্গে আব্বার আত্মীয়ের মতো সম্পর্ক ছিলো। আব্বাকে তারাভাই বললেন,”মামা দেশের পরিস্থিতি খারাপ। আপনাদের শহরে থাকা যাবে না। তাই আব্বা আমাকে পাঠালেন আপনাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য।” (এই জায়গাটা লিখতে আমার খুব কষ্ট হয়।)
আব্বা বললেন,” আমি এখন যাবো না। বাসায় এত এত জিনিষপত্র। ওদের নিয়ে যাও। আমার কিছু হবে না। আমার বন্ধুক আছে। আত্মরক্ষা করতে পারবো। বিহারীরা আক্রমন করলে আমি দৌড়ে পাশের পুকুরে কচুরিপানার মধ্যে নিজেকে আড়াল করতে পারবো কিন্তু ফ্যামিলি থাকলে পারবো না।” আম্মাকে বললেন,”দেশের পরিস্থিতি এরকম থাকবে না। দেশ স্বাধীন হবে। আমি তোমাদের টেলিগ্রাম করবো তোমরা বাসায় চলে আসবে।” আমি আজও আমার বাবার টেলিগ্রামের অপেক্ষায় আছি। বিশ্বাস করি একদিন আমার টেলিগ্রাম আসবে। আমিও চলে যাবো এবং আব্বার দেখা পাবো।

নিচতলার সালাম ভাইয়াদের বাড়ী ছিলো ময়মনসিংহে। তাঁরা বাড়ী যেতে পারছিলেন না। সালাম ভাইয়ার বাবা রাতে আব্বার সাথে কথা বললেন। ঠিক হলো উনারা আমাদের সাথে আওলাকান্দী যাবেন। সেখান থেকে নৌকায় নদী পার হয়ে (যমুনা নদীর শাখা) কোনরকমে জামালপুর পৌঁছাতে পারলেই বাড়ী যেতে পারবেন। আব্বা রাজী হলেন।

পরদিন সকালে আমরা ১২/১৪ জনের একটা শরনার্থী দল স্টাফ কোয়ার্টার ৪ নম্বর বিল্ডিং থেকে রিকসায় গেলাম চ্যালোপাড়া। চ্যালোপাড়া থেকে ঘোড়ার গাড়ীতে গেলাম পোড়াদহ। ঘোড়ার গাড়ীতে উঠার সময় পপিকে আম্মার কোলে দিয়ে আব্বা বললেন,” যা তোদেরকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিলাম।” তারপর বাঙালী নদী পার হয়ে গরুর গাড়িতে আওলাকান্দী যখন পৌঁছলাম তখন অনেক রাত। বাড়ীর সবাই আমাদের খুবই আপ্যায়ন করলেন। একদিন পর সালাম ভাইয়ারা চলে গেলেন।

দেশের পরিস্থিতি তখন আরও খারাপ। শহরের সব মানুষ গ্রামে চলে আসতে থাকলো। বগুড়া শহর থেকে আওলাকান্দী গ্রাম বিশ মাইল দূরে। শহরে বোম্বিং হয়। মেশিনগানের শব্দ হয়। বিশ মাইল দুর থেকে শোনা যায়। শহরের মানুষ ছুটে ছুটে গ্রামে আসলেও আব্বার কোন খবর আমরা পাই না। আব্বা আসেন না। সকাল হলেই তিন মেয়ে হাতে কোলে নিয়ে আম্মা রাস্তায় যেয়ে দাড়িয়ে থাকেন। বাড়ীর ভেতর এসে কাঁদেন। আম্মা কাদলে আমরা তিন বোন কাঁদি।আমার মনে হয় চারদিক অন্ধকার। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। আব্বাকে দেখতে না পেয়ে আমার দুই বোন প্রচন্ড অসুস্থ হলো।

একদিন আব্বার একজন কলিগ আসলেন। বাইরে থেকে ডাকছেন,” ওহাব সাহেব,ওহাব সাহেব।” আম্মা বের হলেন। ঐ চাচা বললেন,” ওহাব সাহেব এখানে নেই ? উনার তো এখানেই থাকার কথা?” আম্মা বললেন, ” না উনি তো বাসায় আছেন। এখানে তো আসেননি।” ঐ চাচা দ্বীগুন আশ্চর্য হয়ে বললেন, ” কি বলেন? বাসায় কিভাবে থাকবে? ষ্টাফ কোয়ার্টারে কিচ্ছু নেই। শহরে কোন বাঙালি নেই। শুধু বিহারী আর মিলিটারি। তাহলে ওহাব সাহেব কোথায় গেলেন? কি হলো তাঁর??” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,” অফিসে তো খবর দিতে হবে।”এই বলে চলে গেলেন।

তারপর আর একদিন আব্বার খুব কাছের একজন। আব্বার কলিগ সালাম চাচা আসলেন। আমরা ভাবলাম নিশ্চয়ই আব্বা কোথাও আছেন, সে খবর দিতে সালাম চাচা এসেছেন। তিনি বৈঠকখানায় বসলেন। সবাই তাঁকে ঘিরে বসলো। আম্মা দাঁড়িয়ে ছিলেন।


আব্বার খবর শোনার জন্য আম্মার পাশে আমিও দাড়িয়ে ছিলাম। সালাম চাচা বললেন, “আমার ফ্যামিলি আমি আগেই দেশের বাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছি । এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখে ওহাব সাহেবের সাথে আমিও তাঁর বাসায় ছিলাম। স্টাফ কোয়ার্টারে শুধু একটা হিন্দু পরিবার ছিলো (সেই ড্রাইভার সাহেব)। সন্ধ্যার পর সেই পরিবার প্রধান এসে ওহাব সাহেবকে বললেন,” দেশের পরিস্থিতি তো খুব খারাপ। আমরা বাড়ী চলে যেতে পারছিনা। এখন আমার যুবতী মেয়ে নিয়ে আমি কোথায় যাবো?” ওহাব সাহেব বললেন আমার বাসায় থাকেন।” আমরা পাঁচ জন ওহাব সাহেবের বাসায় রাতে থাকলাম। সকালে ফজরের নামাজ পড়ে কুরআন শরীফ পড়ছিলেন ওহাব সাহেব। এমনসময় শত শত বিহারী হৈ হৈ, চিৎকার করতে করতে স্টাফ কোয়ার্টার আক্রমন করে। আমি বললাম, ওহাব সাহেব বিহারীরা আক্রমন করেছে, তাড়াতাড়ি চলেন পালাতে হবে। ওহাব সাহেব বললেন আমি পালাবো না। আপনি যান। বার বার বলার পরও ওহাব সাহেব গেলেন না। আমি একদৌড়ে ছাদে উঠে গড়াতে গড়াতে কিনারে গিয়ে পেছনের পাইপ বেয়ে নিচে নেমে দৌড়ে যখন পিওন কোয়ার্টারে পৌঁছালাম তখন প্রচন্ড গুলির শব্দ শুনলাম। সমস্ত ক্যাম্পাসে লুটতরাজ করে বিহারীরা আবারো চিৎকার করতে করতে যখন চলে গেল তখন আমি ওহাব সাহেবের খোঁজে আবার ক্যাম্পাসে আসলাম। কিন্তু কোন লাশ দেখতে পেলাম না। ওহাব সাহেবের আর কোন খোঁজও পাইনি।”
আম্মা চেয়ার টেবিলের মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। আমরা তিন বোন কান্না করছি। বাড়ীর লোকজন আম্মাকে তুলে এনে মাথায় পানি দিলে জ্ঞান ফিরল। আমি লক্ষ্য করলাম সালাম চাচা কাঁপছেন। আবারও বললেন,”চিন্তা করবেন না। ওহাব সাহেবকে বিহারীরা হয়তো মারতে পারেনি। ওহাব সাহেব চালাক মানুষ। নিশ্চুই কোথাও পালিয়ে গেছেন। হয়তো মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারত চলে গেছেন। রাজশাহী চলে যেতেও পারেন। দেখবেন দেশ স্বাধীন হলে নিশ্চয় ফিরে আসবেন। দোয়া করেন।”
কিন্তু বাড়ীর লোকদের সালাম চাচা বলে গেলেন,” ওহাব সাহেব নেই। বিহারীরা ঐ হিন্দু পরিবারের তিনজনসহ ওহাব সাহেবকে গুলি করে মেরে ফেলেছে।”

তারপর থেকে বাড়ীর লোকজন আম্মাকে মিথ্যা শান্তনা দিতো। আমরা আবার আগের মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতাম আব্বা আসবেন সেই আশায়। আমি আম্মাকে বলতাম,” আম্মা আমরা কবে বাসায় যাবো? এখানে ভাল লাগে না।” আম্মা বলতেন,” তোমার আব্বা আসলেই আমরা চলে যাবো।”

মিথ্যা আশ্বাস আর আশায় আমাদের দিন পার হয়ে রাত আসে। রাত পার হয়ে দিন আসে। আমার আব্বা আসে না।
একদিন হাসিবুল ভাই আসলেন। আমাদের দু’বোনকে দুই হাতে ধরে চিৎকার করে কান্না করছেন। আম্মা সেদিন বুঝলেন সীমার বাবা নেই!

হাসিবুল ভাই বগুড়া পরিবার পরিকল্পনা অফিসে চাকরি করতেন। বাড়ী রাজশাহী। মালতীনগরে দুই কন্যা নিয়ে হাসিবুল ভাই আর ডলি আপার সংসার। যুদ্ধ শুরু হলে উনাদের ট্রেনে তুলে দিয়ে আব্বা বলেছিলেন,” বাড়ী চলে যাও দেশের পরিস্থিতি খারাপ।” হাসিবুল ভাই বলেছিলেন,” মামা আপনি আওলাকান্দী চলে যান।” আব্বা বলেছিলেন,” হ্যা চলে যাবো।”

যখন সমস্যার কথা বলেছে, তখন সেটা সমাধান করেছেন আমার বাবা। শুধু আমরা অথৈ সাগরে পড়ে যাবো এটা ভাবেন নি। একটা বজ্রকঠিন আত্মবিশ্বাস ছিলো আব্বার,দেশ স্বাধীন হবে। মুখোচ্চারিত বানী ছিলো,” স্টাফ কোয়ার্টার বাঁচাতেই হবে।” আমার বাবার ষ্টাফ কোয়ার্টার বেঁচেছে,দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ঐ ষ্টাফ কোয়ার্টারে আমাদের কোন অধিকার নেই। আমার বাবা যদি অসুস্থ হয়ে বা বার্ধকে মারা যেতেন, বা কোন অন্যায় করতেন, আমি বাবার মৃত্যূ মেনে নিতাম।

আওলাকান্দীতে আমরা ছয় মাস থাকলাম। তারা ভাই এর মা কে আব্বা বোন পেতেছিলেন। ফুফুআম্মা আম্মাকে এবং আমাদের অনেক আদর করেছেন ছয় মাস। তারপর আমার নানাভাই খবর পেয়ে আমাদের নেওয়ার জন্য আসলেন। ফুপা বললেন,” দেশের পরিস্থিতি খারাপ, রাস্তায় কোন নিরাপত্তা নেই। এখন ওদের যেতে দেবো না। আমার মেয়েদের মতোই তিনিও। দেশ শান্ত হলে নিয়ে যাবেন।” আমার নানাভাই চলে গেলেন। তারপর একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে নানাভাই আবার আসলেন। বাড়ীর লোকজন চোখের জলে আমাদের বিদায় দিলেন। যখন বাঙালি নদী পার হয়ে গেলাম,তখন আমাদের সব ছিলো। কিন্তু যখন পুনরায় পার হয়ে আসলাম তখন আমরা সব হারিয়ে ফেলেছি।

শহরে এসে হাসিবুল ভাইয়ের বাসায় উঠলাম। পরদিন হাসিবুল ভাই আমাদের নিয়ে এস বই ও অফিসে গেলেন। এস ডি ও মহোদয় আম্মাকে ৩০০ টাকা দিলেন। রাজশাহী পৌঁছানোর জন্য। রাজশাহী শহর থেকে ১৬ মাইল দুরের গ্রামে আমার নানার বাড়ী। গ্রামের নাম বড়শীপাড়া। শতকরা বিশজন মানুষ অর্ধশিক্ষিত,আশিজনই অশিক্ষিত। বরেন্দ্র অঞ্চল।উপর ওয়ালার কৃপায় বছরে একটা ফসল ঘরে তুলতে পারেন তাঁরা। সেখানেও যুদ্ধের আতঙ্ক মানুষের মনে। একপাশে বিরাট হিন্দু পাড়া। কিন্তু হিন্দু পাড়ায় একটা মানুষ ও ছিলো না। সবাই ভারত চলে গিয়েছিল। ডিসেম্বর মাসের প্রথমদিকে শোনা গেল প্রচন্ড যুদ্ধ হচ্ছে। বড়শীপাড়ায় মিলিটারি আসবে। আমার মামা ঠিক করলেন এবার ভারত চলে যেতেই হবে। আম্মা বেঁকে বসলেন,” আমি যাবো না। এখানেই থাকবো। যদি আওলাকান্দী না যেয়ে বাসায় থাকতাম তাহলে সীমার আব্বা শেষ পর্যন্ত আমাদের নিয়ে অবশ্যই সরে যেতো বাসায় থাকতো না। বাসায় থাকলেও বিহারীরা একসাথে আমাদেরও মেরে ফেলতো, সেই ভালো ছিলো। আমি আর কোথাও পালাবো না।” এমনিভাবে ভয়, আতঙ্ক, দুঃখ হাহাকারের মধ্য দিয়ে একদিন ১৬ই ডিসেম্বর আসলো। বড়শীপাড়ার বুকেও স্বাধীনতা আছড়ে পড়লো। সবাই আনন্দ করলো। মিষ্টান্ন বিতরন করলো। আমিও হাত পেতে মিষ্টি নিলাম। স্বাধীনতা কি বোঝার বয়স হয়নি তাই বুঝলাম না। শুধু বুঝলাম, এই দিনটার জন্য আমরা বাবাহারা।

তারপর ও দিনের পর দিন আম্মা রাস্তার ধারে বসে থাকতেন। হঠাৎ হঠাৎ বলতেন,” তোর আব্বাকে বিহারীরা মারতে পারেনি। নিশ্চুই কোথাও আছে। আসবে। তিনটা মেয়ের জন্য আসবেই। কেউ আটকে রাখতে পারবে না।” আবার কখনও বলতেন,” তোর আব্বা হয়তো পাকিস্তানীদের অত্যাচারে পাগল হয়ে কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

আমি দীর্ঘদিন পাগোল দেখলেই তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো,’ আমার বাবা হতে পারে। ভালোভাবে দেখে বুঝতাম আমার বাবা নয়। ২০০৬ সাল। অফিসে যাচ্ছিলাম। আব্বার কথা ঐ মুহুর্তে মাথায় ছিলো না। হঠাৎ রিকসার সামনে একটা পাগোল। আমার ক্ষতবিক্ষত মস্তিষ্ক বললো, আমার বাবা হয়তো। পেছনের পর্দা তুলে বার বার দেখলাম। না আমার প্রানপ্রিয় বাবা না।

১৯৭৪ সাল। আমি ক্লাশ ফাইভে পড়ি। আমার নানাভাই এর সাথে বগুড়া গেলাম। আমার পায়ে স্যান্ডেল ছিলো না। খালি পায়ে রাজশাহী শহর পর্যন্ত আসলাম। তারপর নানাভাই আমাকে অক্ষয় স্যান্ডেল কিনে দিলেন। বগুড়া স্টাফ কোয়ার্টারের আট নম্বর বিল্ডিং এ মান্নান মামার বাসায় উঠলাম। পরদিন সকালে নাস্তা খেয়ে শুয়ে আছি। আমার সাথে যারা খেলতো তারা এসে হাজির হলো। আমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। ওরা ফিস ফিস করে বলছে,” সীমা সীমা।” আমি তাকালাম ও না ওদের দিকে। আমার মনে হলো, ওদের এহেন নিরাপদে ছুটাছুটি করে খেলার জন্য আমি বাবাহারা। এই ক্যাম্পাসে ওদের যে অধিকার আছে আমি সেটা হারিয়ে ফেলেছি। বিকেলে আবুল চাচা আমার দিকে করুনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,” এমন স্বাধীনতা চাইছি আমরা।”


তারপর শুনলাম, আমার আব্বাকে প্রথমে গুলি করা হয়েছিলো,তারপর ছুরি দিয়ে জবেহ করে বি টাইপ বিল্ডিং-এর পেছনের সেফটি ট্যাংকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো বিহারীরা। স্বাধীনতার পর সেফটি ট্যাংক পরিষ্কার করার সময় মানুষের মাথা উঠেছিলো। ক্যাম্পাসের সবাই দৌড়াদৌড়ি করে দেখতে গিয়েছিলো এই বলে,” সীমার আব্বার মাথা উঠেছে, সীমার আব্বার মাথা উঠেছে।” কে সীমা না জানলেও স্টাফ কোয়ার্টারবাসীরা জানতো এখানে সীমার আব্বাকে একাত্তর সালে মেরে ফেলেছে বিহারীরা। এখন হয়তো মানুষ জানার চেষ্টাও করে না,কার কলিজা নিংড়ানো রক্তের বিনিময়ে একদিন বেঁচে গিয়েছিলো পুরো স্টাফ কোয়ার্টার।পরে আরও জেনেছি, রসিক বিহারী ও তার দলবল আমার বাবার খুনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design & Developed by : BD IT HOST